Biography

সিরাজুল হোসেন খান


সিরাজুল হোসেন খান ছিলেন একাধারে রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাতা, শ্রমিক নেতা এবং সাংবদিক। তরুণ বয়সে ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৪৮ সালে ইস্ট পাকিস্তান মুসলিম স্টুডেন্টস লিগ এর কেন্দ্রীয় কমিটিওতে তিনি অন্তর্ভুক্ত হন সিলেটের প্রতিনিধি হিসেবে। ঐ কমিটিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং পাবনার আব্দুল মতিনও সদস্য ছিলেন। ১৯৪৯ সালে তিনি দৈনিক পাকিস্তান অবজার্ভার পত্রিকার সহসম্পাদক হিসেবে সাংবাদিকতা পেশায় যোগ দেন । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাশ করার পর পুর্বপাকিস্তান সরকারের প্রচার বিভাগে যোগ দেন এবং এক দশক পর ইস্তফা দিয়ে ১৯৬১ সালে বামপন্থী প্রগতিশীল রাজনীতির সাথে যুক্ত হন। এই সময় তিনি লাহোর থেকে প্রকাশিত পাকিস্তান টাইমসএর ঢাকা সংবাদদাতা ও ব্যুরো প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন। শ্রমিক আন্দোলনের সাথে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত হয়ে তিনি ১৯৬৫ সালে পূর্ব পাকিস্তান শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। শ্রমিক আন্দোলনের নেতা হিসেবে থাকা অবস্থায় তিনি ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টিও সার্বক্ষণিক কর্মী। তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমে এই ভুখ-ে ট্রেডইউনিয়ন আন্দোলন হয়ে ৗঠে যথেষ্ট শক্তিশালী। কৃষক ও শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলনে সোচ্চার নেতৃত্বেও অপরাধে আইয়ুব শাসনামলে এক বছরেরও বেশি সময় কারাবরণ করেন। পাকিস্তানের শাসনামল এমনকি বাংণাদেশ আমলেও তাঁকে আত্মগোপন থাকতে হয়েছে। সবমিলে প্রায় এক দশক তিনি আত্মগোপনে থেকে শ্রমিক ও কৃষকের রাজনীতিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন।
মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর একনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে তিনি আওয়ামীলীগ, ন্যাশনেল আওয়ামী পাটি এবং কৃষকসমিতির আন্দোলনের সঙ্গে সিরাজুল হোসেন খান ছিলেন একাত্ম। কমিউনিস্ট পার্টিও গোপন রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা , মাওলানা ভাসানীর প্রকাশ্য রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং সাংবাদিকতায় নিবেদিত থাকার মধ্য দিয়ে সিরাজুল হেসেন খান প্রতিটি ক্ষণকে ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে কাটিয়েছেন। এর মধ্যে শুরু হয় স্বাধীনতা যুদ্ধ। মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ভারতে জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম সমন্বয় কমিটি গঠিত হলে সিরাজুল হোসেন খান এর অন্যতম সদস্য নির্বাচিত হন। এই দায়িত্বেও অংশ হিসেবে তিনি মুক্তিযুদ্ধরত গেরিলাবাহিনীর একটি ইউনিটের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষার মাধ্যমে কাজ করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর বাংলাদেশে বামপন্থী রাজনীতির বহুধা বিভক্তি তাঁকে মর্মাহত করে।। তিনি মাওলানা ভাসানীর সকল অনুসারীদেও এক করার জন্য অনেক চেষ্টা করেছেন। বামপন্থীদের ঐক্যব্ধ করতে না পারার দুঃখে তিনি হাজী দানেশের নেতৃত্বে জাতীয় গণমুক্তি ইউনিয়ন(জাগমুই) গঠন করেন। পরবর্তীতে অন্য কয়েকটি বামপন্থী দলকে নিয়ে গ’গণতান্ত্রিক পার্টি’ গঠনে তিনিই উদ্যোগী ভূমিকা পালন পালন করেন।
সাংবাদিকতা পেশার মধ্যেই তিনি ১৯৭০ সালে ইস্টার্ন নিউজ এজেন্সি (এনা) নামে একটি সংবাদ প্রতিষ্ঠান গঠন করেন এবং তিনি হন এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। বাংলাদেশ হৗয়ার পর সাপ্তাহিক ’হলিডে’ পত্রিকাসহ কয়েকটি পত্রিকায় তিনি রাজনৈতিক কলাম লেখা শুরু করেন। এসময় তিনি সরকারের ভ্রান্ত নীতির কঠোর সমালোচনা করতেন। বস্তুনিষ্ঠ লেখনী ছিল সেসব কলামের বৈশিষ্ট্য। ছাত্রজীবন থেকেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকায় সাংবাদিক হিসেবে তিনি তাঁর মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁর কিছু কলামে ঐ সময়ে বঙ্গবন্ধুর অসহায়ত্বেও কথাও বিবৃত হয়েছে।

সিরাজুল হোসেন খানের মন্ত্রীত¦ গ্রহণ ছিল অভাবনীয়। ১৯৮৫ সালের প্রথমার্ধ পর্যন্ত তিনি ছিলেন স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের একজন কট্টর সমালোচক। কিন্তু ৩ জুলাই তারিখে আমরা তাঁকে দেখতে পাই এরশাদ সরকারের মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে। হাজী মোহাম্মদ দানেশ ও সিরাজুল হোসেন খান এ দু’জন মানুষকে বাংলার মানুষ বরাবর নির্মোহ বিপ্লবী হিসেবে দেখে এসেছে। এরশাদ সাহেবের কাছ থেকে বিপ্লবকে এগিয়ে নেওয়ার কী প্রতিশ্রুতি তাঁরা পেয়েছিলেন তা এখনো আমাদেও কাছে অজানা। তবে সিরাজুল হোসেন খান কর্তৃক’ জাল যার জলা তার’ এ অধিকারের বাস্তবায়ন কিছুটা হলেও আমরা দেখতে পেয়েছিলাম। যুগযুগ যাবৎ জলায় সামন্তবাদী দখল দরিদ্র জেলেদের নির্মমভাবে শোষণ করে আসছিল। মাৎস ও পশুপালন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হয়ে প্রায় এককোটি মৎস্যজীবীর জীবনে তিনি আশার আলোকবর্তিকা দেখাতে পেরেছিলেন। নীতিমালার ফলে প্রকৃত মৎস্যজীবীরা সমবায় জলমহালের ওপর নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিল। এটা কতটা স্থায়ী হয়েছিল সেটা অবশ্য ভিন্ন প্রসঙ্গ। এ নিবন্ধকার মন্ত্রীত্বের সময় তাঁর বাসায় একদিন গিয়ে তাঁকে খুব উত্তেজিত দেখতে পান। পরে জানা যায় , সমবায় সমিতির জন্য জলমহাল বরাদ্দের খায়েস নিয়ে এক ধণাড্য ব্যক্তি এসেছিলেন ব্রিফকেস ভর্তি অর্থ নিয়ে। পুলিশের হাতে দেওয়ার আগে সে পালিয়ে যেতে পেরেছিল বলে তিনি খুব উত্তেজিত ছিলেন। তাঁকে এরকম উত্তেজিত হতে দেখেছি কারো কোনে সাম্প্রদায়িক উক্তির কারণে। তিনি কিছুদিন ভূমি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীও ছিলেন। ঐ সময় ভূমি রাজস্ব বোর্ড গঠন ও ঋণশালিসি বোর্ডের কার্যকারিতা বাড়াতে চেষ্টা করেছেন। নীতিমালায় না আনতে পারলেও তিনি ছিলেন ’ লাঙল যার জমি তার ’ নীতির অবিচল সমর্থক। মন্ত্রীত্বেও ছয় বছরই তিনি খুবই সাধারণ জীবনযাপন করেছেন। নিজে যেমন তোষামোদ করেননি কাউকে তোষামোদ করার সুযোগও দেননি। মন্ত্রী হিসেবে সফরের সময় কোথাও তোরণ নির্মিত হলে তিনি তা অপসারিত করিয়ে তবে সেখানে গিয়েছেন।
বিশ্বের বৃহত্তম গ্রাম বানিয়াচঙ্গে তিনি জন্মগহ্রণ করেছিলেন ১৯২৪ সালে। মাধ্যমিক অবধি লেখাপড়া করেছেন বানিয়াচং এলআর হাই স্কুলে। এ গ্রামের প্রতি তাঁর ছিল প্রবল আকর্ষণ। যেখানেই থেকেছেন গ্রামে গিয়েছেন অনেক। গ্রামকে তোলে ধরার জন্য তিনি বেশ কিছু প্রবন্ধও লিখেছেন। তাঁর লেখা থেকে আমরা জানতে যে, বানিয়াচঙ্গে একবার ম্যালেরিয়ায় হাজার হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল। ঐ বছর মাওলানা ভাসানী আসাম গণপরিষদে বানিয়াচঙ্গের এ মহামারীতে সরকারকে সাহায্য করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ঐ আহ্বানের কারণে মূখ্যমন্ত্রী সাদুল্লা বানিয়াচং এসেছিলেন। আমরা তাঁর নিবন্ধ থেকে বাইসাইকেলে বিশ্বপরিব্রাজক রামনাথবিশ্বাসের কথা জানতে পারি। রামনাথ বিশ্বাসই প্রথম বলেছিলেন যে, বানিয়াচং বিশ্বেও সর্ববৃহৎ গ্রাম। সিরাজুল হেসেন খানের পিতা আবুল হোসেন খান ও পিতৃব্য এ্যাডভোকেট নুরুল হোসেন খান ছিলেন মুসলিমলীগ রাজনীতির প্রগতিশীল অংশের সাথে সম্পর্কিত। গ্রামের গ্রতি তাঁর ভালোবাসায় কোনো খাঁদ ছিল না। তাঁর চেষ্টায় হবিগঞ্জ বানিয়াচং সড়কটি পূর্ণ চলাচল উপযোগী হয়। এতদস্বত্বেও তিনি ছিলেন সঙ্কীর্ণ আঞ্চলিকতার বিরোধী। তাই অযৌক্তিক দাবি-দাওয়া নিয়ে কেউ হাজির হলে তিনি বলেছেন আমি বাংলাদেশের মন্ত্রী, বানিয়াচঙ্গের মন্ত্যী নই। তাঁর এ বক্তব্য নিয়ে প্রতিক্রিয়াশীল মহল নানা কথা বলাবলি করে। কিন্তু মনে রাখতে হবে সিরাজুল হোসেন খান বানিয়াচঙ্গের কৃতি সন্তান। তিনি যা বলেছিলেন তা ছিল খুবই সত্য উচ্চারণ।