General News

একটি দিন হোক গাড়ি পোড়ানোর দিন ।। আনিসুল হক

প্রিয় দেশনেতাগণ,
আমাদের আন্তরিক সালাম নেবেন। আশা করি, পরম করুণাময়ের কৃপায় এবং জনগণের প্রত্যেকের আন্তরিক আশীর্বাদে আপনারা সবাই কুশলে আছেন। হরতালের শান্তিপূর্ণ দিনটি আপনারা বিলম্বিত প্রাতরাশ, স্বতঃস্ফূর্ত দিবানিদ্রা, পরিজনপরিবৃত পারিবারিক ও আন্তরিক মধ্যাহ্নভোজ সহযোগে আরামেই অতিবাহিত করছেন। জনগণ স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল পালন করায় বা জনগণ অযৌক্তিক হরতাল প্রত্যাখ্যান করায় জনগণকে প্রদেয় বিপ্লবী অভিবাদনের প্রেস বিজ্ঞপ্তিটি অনেক আগেই ফটোকপি করে রাখা আছে, সন্ধ্যার সময় তা বিভিন্ন গণমাধ্যমের বার্তা সম্পাদক সমীপে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই পৌঁছে যাবে। কাজেই আজকের দিনটি আপনাদের সবার জন্য একটি শুভ, শান্তিপূর্ণ, নির্বিঘ্ন অখণ্ড অবকাশ ও অবসর যাপনের দিন। এই দিন আপনার আর আপনার পরিবারের সবার জন্য বয়ে আনুক অপরিমেয় সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য, বিনোদন ও মানসিক প্রশান্তি। টেলিভিশনের খবরে একঝলক দেখে নিতে পারেন, কটা গাড়িতে বারুদসহযোগে অগ্নিসংযোগ করা হলো, কতজন মানুষ জীবন্ত দগ্ধ হলো, কতজন মরার পরে পুড়ল। কত টাকার ককটেল ফোটার কথা ছিল, কটা ফুটেছে, কর্মীরা টাকা আত্মসাৎ করেছে কি না, তা আরেক দিন হিসাব করলেও চলবে।

মাননীয় দেশসেবকগণ,
হরতালের দিনে শান্তিপূর্ণভাবে গাড়ি ভাঙচুর করা হবে, অটোরিকশায় আগুন দিয়ে চালকসমেত শান্তিপূর্ণভাবে পুড়িয়ে কাবাব বানানো হবে, এটা যে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর গণতান্ত্রিক অধিকার—এ দেশের মানুষ তা মেনেই নিয়েছে। হরতালের দিন দোকানপাট খোলা হলে সেই দোকান লুট করা যাবে, সেই দোকানে অগ্নিসংযোগ করা যাবে, সেই দোকানি ও আশপাশের পথচারীদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা যাবে—এই শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক অধিকার বহু আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। কেউ হরতালের দিন গাড়ি বের করে যদি অক্ষত গাড়ি, পূর্ণ জীবন ও শরীর নিয়ে ঘরে ফিরে না আসে, তার দায়িত্ব কোনো রাজনৈতিক দলের নয়, না বিরোধী দলের, না সরকারের, এটা তো অলিখিত বিধান—জনগণ এটা জানে এবং মানে। অফিসগামী কোনো কর্তাকে কোনো পিকেটার যদি উলঙ্গ করে ছাড়ে, তা নিয়েও আমরা কোনো দিন কোনো উচ্চবাচ্য করেছি, কেউ কোনো দিন বলতে পারবে? হরতালের দিন পুলিশের সঙ্গে লড়াই হবে, পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছুড়বে, প্রত্যুত্তরে ঢিল খাবে, ককটেল খাবে, গুলিও চলতে পারে। তারপর আশপাশের যা কিছু আছে, তাতে অগ্নিসংযোগ করার অধিকার ন্যায়সংগত, তা কি আমরা মেনে নিইনি? সেই ভীষণ গোলাগুলি-ঢিলাঢিলির মধ্যে পড়ে নিরীহ পথচারী, শান্তিপ্রিয় বৃদ্ধ কিংবা ঘরে ক্রীড়ারত বালকের মৃত্যু হলেও আমরা আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছেন বলেই সান্ত্বনা খুঁজে ফিরব।

হে জন-অধিকারের প্রবক্তাগণ,
কিন্তু হরতালের আগের দিনের গাড়িগুলো কী দোষ করল? হরতালের আগের সন্ধ্যায় গুলিস্তানে কিংবা রূপসী বাংলার (শেরাটন) সামনে একটা-দুটো বাসে বারুদ দিয়ে আগুন দেওয়া হবে, তাতে দু-চারজন বাসযাত্রীর রোম পুড়বে, চামড়া পুড়বে, মাথার চুল পুড়বে, জামা-কাপড়-জুতা পুড়বে, বুকের হাড় পুড়বে, মগজ গলবে, হূৎপিণ্ড পুড়বে, হাত-পা পুড়ে কালো হয়ে বেঁকে-চুরে যাবে, পড়ে থাকবে কয়লার মতো কিছু দলা, সেটাও তো আমরা বহু আগে মেনে নিয়েছি। কারণ, পরের দিন সকালবেলা সব কাগজের প্রথম পাতায় দাউ দাউ করে জ্বলন্ত বাসের ছবি দেখে পাঠকসাধারণের পিলে চমকে উঠবে, তাদের শিরদাঁড়া দিয়ে বরফের সাপ নেমে যাবে। তারা বুঝে নেবে, আজ হরতাল। এটাকে শান্তিপূর্ণ ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালন করতে আমরা বাধ্য। আমরা জনগণ, আমাদের অধিকার কায়েমের জন্য আমাদের প্রিয় ক্ষমতাবঞ্চিত নেতাদের গদিতে বসানো প্রয়োজন। কাজেই তাঁদের ইচ্ছার আগুনে বলি হওয়াতেই আমাদের সুখ ও সার্থকতা।

কিন্তু ঘোরতর দুপুরবেলা বিনা মেঘে রাস্তায় নেমে বারুদ ঢেলে দিয়ে যাত্রীবাহী বাসে, টেম্পোতে, ট্রাকে, হিউম্যান হলারে, গাড়িতে, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কোচে নির্বিচারে শান্তিপূর্ণভাবে অগ্নিসংযোগ করার মহামারির কারণটা কী? হরতালের আগের দিন তো হরতালের দিন নয়! আপনারা তো বলেননি, আজ গাড়ি বের করলে তা পোড়ানো আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। জনসাধারণকে আগে থেকে নোটিশ না দিয়ে এতগুলো গাড়িতে আপনারা অগ্নিসংযোগ করছেন কেন? পাকিস্তানিরা একাত্তর সালে পোড়ামাটিনীতি অবলম্বন করেছিল। তারা বাংলার মানুষ চায়নি, চেয়েছিল শুধু মাটিটুকুন। সেটা পুড়ে তামাটে হয়ে গেলে, কোনো জনবসতির চিহ্ন না থাকলেও তাদের আপত্তি ছিল না। এখন কি আমাদের দেশপ্রেমিক নেতারা পোড়াগাড়িনীতি অবলম্বন করেছেন? এখন তাঁরা গাড়ি দেখলেই আগুন দেবেন? এত দিন ছিল শুধুই চার চাকার বা তিন চাকার গাড়ি; এখন তো বহু চাকার ট্রেনেও আগুন দেওয়া শুরু হয়েছে। লঞ্চগুলো কপালের কোন দোষে বাদ পড়ল? নদীতে নেমে লঞ্চগুলোতেই আগুন দিন, ওটাও আপনাদের অধিকার।

হে মহানুভব,
হরতালের দিন যারা স্বতঃস্ফূর্ত শান্তিপূর্ণ হরতাল মানে না, তাদের উপযুক্ত সমাদর করা হরতালকারীদের পরম কর্তব্য ও গণতান্ত্রিক অধিকার—এটা তো বাংলাদেশের বীর জনগণ মেনেই নিয়েছে। তাহলে আপনারা আরেকটা কাজ করুন, আপনাদের কর্মসূচিগুলোকে এভাবে ঘোষণা করুন—আগামী রবি ও সোমবার সারা বাংলায় সর্বাত্মক হরতাল এবং শনিবার সারা দিন সারা দেশে গাড়ির বহ্ন্যুৎসব। হরতালের আগের দিন রাস্তায় যে গাড়ি দেখা যাবে, তার শীতাতপনিয়ন্ত্রিত আন্তনগর পরিবহনই হোক, আর গরিবের মিশুকই হোক, তাতে অগ্নিসংযোগ করার স্বতঃস্ফূর্ত অধিকার বাংলার জনগণের আছে। তাহলে আমরা হরতালের আগের দিন আর গাড়িঘোড়া বের করব না। দোকানপাটও বন্ধ রাখব।

প্রিয় নেতাগণ,
আমরা আপনাদের কোন ডাকে সাড়া দিইনি, কোন কথাটা শুনিনি? হরতালের আগের দিন গাড়ি-বাড়ি পোড়ানো হবে—এই ডাকটা স্পষ্টভাবেই দিয়ে দিন। আমরা হাততালি দিয়ে সেটা মেনে নেব এবং ফুলের মালা তৈরি করে আপনাদের গলায় পরিয়ে দেব। সেটা আপনারা ‘এ’ দলের নেতা হোন আর ‘বি’ দলের নেতাই হোন।
নেতাদের জয় মানেই জনগণের জয়।