General News

বানিয়াচঙের অনাবিষ্কৃত জলাবনে...| মনসুর উদ্দিন আহমেদ ইকবাল

ভ্রমণ সবসময়ই মানুষকে কাছে টেনেছে। ভিন্ন দৃশ্য দর্শনের স্বাদ পেতে মানুষ বিদেশ বিভূঁইয়েও পাড়ি জমিয়েছে। আবার কখনো বা নিজ দেশেই মানুষ চেয়েছে বৈদেশিক সব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত স্থান অবলোকনের সুযোগ। ঠিক তেমনিই পৃথিবী বিখ্যাত জলজ বন আমাজানের মতো বাংলাদেশেও বর্তমানে আবিষ্কৃত হচ্ছে জলজ বন।

সিলেটের গোয়াইনঘাটের ‘রাতারগুল’ বেশ জনপ্রিয় হলেও সম্প্রতি এশিয়ার বৃহত্তম গ্রাম বানিয়াচং-এর লক্ষী বাউর এলাকায় এক রীতিমত অনাবিষ্কৃত এক জলাবন বা সোয়াম্প ফরেস্ট পাওয়া গেছে। যা আরো বেশি আকর্ষণীয়। আর সেই বন নিয়েই আমাদের আজকের আয়োজন।

শুরুর কথা
ইদানিং সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার “রাতারগুল” নামক সোয়াম্প ফরেষ্ট বা জলাবন সম্পর্কে পত্রপত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হলে বেশ পরিচিতি পায়। কিন্তু হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার লক্ষ্মী বাউর জলাবনের সাথে এর সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যায়। রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্টকে কেউ কেউ দেশের একমাত্র সোয়াম্প ফরেষ্ট হিসেবে উল্লেখ করলেও বানিয়াচং-এর লক্ষ্মী বাউর সোয়াম্প ফরেষ্ট একই শ্রেণীভুক্ত এবং তুলনামূলক অনেক বড়।

বয়স্ক জলাবন
বানিয়াচং উপজেলার প্রান্ত সীমানায় খড়তি নদীর দক্ষিণ দিকে বিরাট হাওরের মধ্যে অবস্থিত এই জলাবন এলাকাবাসীর নিকট খড়তির জঙ্গল নামেও পরিচিত। কখন এই জঙ্গল সৃষ্টি হয় তা এ অঞ্চলের প্রবীণরাও বলতে পারেন না। এখানে প্রকৃতির এই বিচিত্র রূপ সত্যিই বিস্ময়কর।

বনের অবস্থান
হবিগঞ্জ থেকে ১২ মাইল দূরবর্তী বানিয়াচং উপজেলা সদরের আদর্শ বাজার নৌকাঘাট থেকে ৫ কিলোমিটার উত্তরে হাওরের মাঝে এ জলাবন।

প্রায় ৩ কিলোমিটার এলাকাব্যাপী জঙ্গলের পূর্বে গঙ্গাজল হাওর ও নূরপুর, পশ্চিমে নলাই নদী, উত্তরে খরতি নদী এবং দক্ষিণে লোহাচূড়া ও শোলাটেকা গ্রাম। জলাবন দেখতে বর্ষাকালে নৌকা, শরৎকালে মোটর সাইকেল, ট্রলিসহ হালকা যানবাহনে কিংবা পায়ে হেটে যেতে হয়।

বানিয়াচঙের অনাবিষ্কৃত জলাবনে...

অবর্ণনীয় সৌন্দর্যের বর্ণনা
বর্ষাকালে চারদিকে হাওরের পানি আর জঙ্গলের অসংখ্য গাছপালার সবুজ অরণ্য পরিবেশকে এক নান্দনিক রূপ দিয়েছে। হাওরে দূর থেকে জঙ্গলটিকে দেখে মনে হবে যেন পানির উপর ভাসছে। হিজল, কড়চ, বরুণ, কাকুরা, বউল্লা, খাগড়া, চাইল্লা, নল ইত্যাদি অসংখ্য গাছ ও গুল্মে পরিপূর্ণ এই জলাবন বলতে গেলে এতদিন অনাবিস্কৃতই ছিল।

বর্ষাকালে কয়েকমাস বনের গাছপালা পানিতে নিমজ্জিত থাকে। বনের ভিতরে কয়েকটি খাল ও বিল রয়েছে। এগুলোর স্বচ্ছ পানিতে জঙ্গলের প্রতিচ্ছবি দেখা যায়।

আশ্বিন মাসের শেষার্ধে বর্ষার পানি কমে যাওয়ায় জলাবনের চারপাশে প্রচুর কচুরীপানা ও ঢোলকলমির ঝোঁপঝাড় এবং মাছ সংরক্ষণের জন্য দেওয়া হয়েছে বাঁশের পাটি বেড়া। এ কারণে নৌকা নিয়ে বনের অভ্যন্তরে বর্তমানে প্রবেশ করা সম্ভব ছিল না। বন এলাকায় রয়েছে জোঁক ও বিষধর সাপের ভয়।

শরৎকালে পানি শুকিয়ে গেলেও বনের ভিতরে থাকা অনেকগুলো বিলে পানি জমে থাকে। বিলগুলোতে প্রচুর মাছ পাওয়া যায়।

জীবজগতের সম্ভার
এই জলাবনে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, সরীসৃপ ও স্তন্যপায়ী জীবজন্তু। এগুলোর মধ্যে রয়েছে মেছোবাঘ, শিয়াল, গুই সাপ, কেউটে, লাড্ডুকা, দারাইশ সহ বিষধর সাপ। বর্তমানে বিভিন্ন জাতের বক, পানকৌড়ী, বালিহাঁস দেখা গেলেও শীতকালে ঝাঁকে ঝাঁকে অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হয় নির্জন এই জলাবন।

বানিয়াচঙের অনাবিষ্কৃত জলাবনে...

আশঙ্কা আর পদক্ষেপ
অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় দীর্ঘদিনের অযত্ন, অবহেলা, প্রতিকূল পরিবেশে জলাবনটি অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। অব্যাহতভাবে গাছ কাটা ও পরিবেশগত কারণে অনেক গাছ মরে যাওয়ায় বনের আকার দিন দিন ছোট হয়ে আসছে।

জানা যায়, লক্ষ্মী বাউর জলাবন বানিয়াচঙ্গ গ্রামের সৈদরটোলা সহ সাত মহল্লাবাসীর নামে ওয়াকফকৃত। জলাবন তত্ত্বাবধান করার জন্য এলাকাবাসীর রয়েছে একটি ৯ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি।

ওয়াকফ এস্টেটের মোতওয়াল্লী ও স্থানীয় পঞ্চায়েতের সরদার এনামুল হোসেন খান বাহার জানান, প্রতিবছর বনের গাছের ডালপালা বিক্রয় করে এবং বিলগুলো ইজারার অর্থ দিয়ে এলাকার ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন ও জনহিতকর কাজে ব্যয় করা হয়।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক শরীফ জামিল বলেন, "স্থানীয় পঞ্চায়েত ও সরকারের সহ-ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে লক্ষ্মীবাউর জলাবন এলাকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র রক্ষার উদ্যোগ নিতে হবে। এই জলাবন সোয়াম্প ফরেষ্টের পর্যায়ে পড়ে কি না এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞদের গবেষণা করা প্রয়োজন।"

স্থানীয় সাংবাদিক আজিমুল হক স্বপন বলেন, "সিলেটের রাতারগুল দেশের একমাত্র সোয়াম্প ফরেষ্ট নয়। বানিয়াচঙ্গের লক্ষ্মী বাউর জলাবনও একই শ্রেণিভুক্ত। এই জলাবনকে আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বানিয়াচং থেকে লক্ষ্মী বাউর জলাবন পর্যন্ত ৫ কিলোমিটার দীর্ঘসড়ক ও লোহাচূড়া নদীর উপর ব্রীজ নির্মাণসহ অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।"

তবে আশার কথা হচ্ছে, এ বছর জলাবনে গাছের চারা লাগানোর একটি কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এছাড়া বনটিকে দেশি ও অতিথি পাখির অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়েছে। কেউ পাখি শিকার করলে ৫ হাজার টাকা জরিমানা আদায়সহ শিকারীকে পুলিশের নিকট সোপর্দ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে স্থানীয় পঞ্চায়েত শক্তিশালী ভূমিকা পালন করছে।